সোয়া দুই শ’ বছর পর স্বীকৃতি পাচ্ছে কওমি মাদরাসা

Spread the love

আজ মন্ত্রিসভায় উঠছে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স (আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান স্বীকৃতি আইন। এর মাধ্যমে প্রায় সোয়া দুই শ’ বছর পর সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে কওমি মাধ্যমে পড়াশুনা করা প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। নতুন আইন অনুযায়ী, দেশের সব কওমি মাদরাসা নতুন একটি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। নতুন বোর্ডের নাম দেয়া হয়েছে আল-হাইয়াতুল উলায়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। এ বোর্ডের অধীনেই নেয়া হবে পরীক্ষা। কওমি মাদরাসা-সংশ্লিষ্ট আরো ৬টি শিক্ষা বোর্ড নতুন বোর্ডের অধীনে কাজ করবে।

বাকি ৬টি বোর্ড হলো বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওগরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশে, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ, তানযীমূল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ এবং জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ। এগুলো দেশে বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও মূল বোর্ড আল-হাইয়াতুল উলায়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়ার কার্যালয় থাকবে ঢাকায়। বোর্ডের কার্যালয়ের জন্য জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের আশপাশে ঘর ভাড়া নেয়া হবে শিগগিরই। এ বিষয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি সাব কমিটি করা হয় বেফাকের পক্ষ থেকে। এ বোর্ডে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। পদাধিকার বলে বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকবেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি। কো-চেয়ারম্যান হবে পদাধিকার বলে বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি। মহাসচিব হবেন পদাধিকার বলে বেফাকের ৫ জন সদস্য বা বোর্ড কর্তৃক মনোনীত। আর ৬টি বোর্ডের সভাপতি ও মহাসচিব এ দুইজন পদাধিকার বলে সদস্য থাকবেন। তবে চেয়ারম্যান ইচ্ছে করলে যেকোনো সদস্যকে কো-অপ্ট করতে পারবেন। তবে সেটা সংখ্যা ১৫ জনের বেশি হবে না। এ বোর্ডের ৬টি কার্যপরিধির ব্যাপারে বলা হয়েছে, এ কমিটি স্থায়ী কমিটি বলিয়া বিবেচিত হবে, সনদ বিষয়ক সব কার্যক্রমের ক্ষেত্রে র্স্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলে বিবেচিত হবে, এ কমিটির দ্বারা নিবন্ধিত মাদরাসা দাওরায়ে হাদিস এর সনদ সমমানের বিবেচিত হবে, এ কমিটি অধীনের ও তত্ত্ববধানে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ণ, ফলাফল ও সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক উপ-কমিটি গঠন করা হবে এবং এ কমিটিগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিষয়গুলো অবহিত করবে। কমিটির এক তৃতীয়াংশ সদস্য (১১জন) উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হবে। সর্বোপরি কমিটি সব দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে। আইনে আরো বলা হয়েছে, কওমি মাদরাসা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ও দারুল উলুম দেওবন্দের মূল নীতিমালাগুলোকে ভিত্তি ধরে এ বোর্ড দাওয়াতে হাদিসকে মাস্টার্স ডিগ্রি সমমানের ডিগ্রি সনদ দিবে। এ আইন সমগ্র বাংলাদেশে দারুল উলুম দেওবন্দের নীতি, আর্দশ ও নিসাব (পাঠ্যসূচি) অনুসরণ করে পরিচালিত হবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বাণী ‘আমি ও আমার সাহাবীগণ যে মত-পথের উপর প্রতিষ্ঠিত এর আলোকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতাদর্শের অনুসরণ করে আম্বিয়া আলাইহিমুস মা’সুম (নিষ্পাপ) হওয়ার বিশ্বাস এবং সাহাবায়ে কিরামে নীতি অনুসরণ করবে। চার মাযহাবের প্রতি শ্রদ্ধা ও পরমত সহিষ্ণতার সঙ্গে হানাফী মাযহাব অনুসরণ করবে, চার তরিকা (চিশতিয়া সোহরাওয়ারদিয়া, নকশবিন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া ও কাদিরিয়া) সহ সব হকপন্থির প্রতি সহনশীল ও উদার মনোভাব পোষণ করবে। বোর্ড পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষা গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, মাদরাসা পরিচালনা ইত্যাদিতে বোর্ডের প্রভাবমুক্ত থাকবে।
জানা গেছে, হেফাজত ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলের দাবি ছিল শুধু দাওরায়ে হাদিসের সনদের স্বীকৃতি দিতে হবে। মাদরাসার শিশু শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা আগের মতোই থাকবে। এগুলোর সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। মাদরাসায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানের মতো সাধারণ বিষয় পড়ানো হবে না। মাদরাসার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পরীক্ষা প্রহণ ও ফল প্রকাশের দায়িত্ব বিদ্যমান বোর্ডগুলোই করবে। মাদরাসা পরিচালনায় সরকারের ভূমিকা থাকতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত এসব দাবি মেনেই স্বীকৃতি দিলো সরকার। গত বছর থেকে সব কওমি মাদরাসায় অভিন্ন প্রশ্নপত্রে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। গত বছরের পরীক্ষাগুলো নেয়ার জন্য গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মাওলানা শামসুল হককে ‘নাযেমে ইমতেহান’ (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক) করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট পরীক্ষা উপকমিটি করা হয়। উপকমিটিতে আরো ছিলেন ৬ জন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, একজন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া গওহরডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, একজন ইত্তেহাদুল মাদারিসিল কওমিয়া চট্টগ্রাম, একজন আযাদ দ্বীনি এদারা বোর্ড সিলেট, একজন তানজিমুল মাদারিসিল কওমিয়া উত্তরবঙ্গ, একজন জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ। বেফাকের মত অনুযায়ী, ছয় বোর্ডের আওতার বাইরে থাকা কোনো মাদরাসা নতুন বোর্ডে নিবন্ধিত হতে পারবে না। বর্তমানে যে মাদরাসা যে বোর্ডে নিবন্ধিত, এ বছর সেই বোর্ডেই থাকতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!