“মুজিববর্ষ” ও আমাদের প্রত্যাশা

 

মোঃ রুহুল আমিন

 

 

১৭ মার্চ, ২০২০ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী। আগামী ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ মার্চ ২০২১ সালকে “মুজিববষ” ঘোষণা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর জীবনী, আদর্শ, উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ত্যাগ, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি স্ব-নির্ভর, সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাণ-পণ প্রচেষ্টা, এমনকি দেশ ও জনগণের স্বার্থে এদেশীয় কতিপয় বিশ্বাস ঘাতক, মীরজাফরদের হাতে নিজের স্ব-পরিবারে জীবন উৎসর্গ তথা শাহাদাৎ বরণ এবং সর্বোপরি তাঁর আদর্শে, পরিকল্পনায় বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে এগিয়ে চলা উন্নয়ন কর্মকান্ডের উপর নানান অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ সরকার। আরো গৌরবের বিষয় যে, বাংলাদেশের সাথে ইউনেস্কো ঘোষিত ১৯৫ টি দেশে জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী তথা মুজিববর্ষ উদ্যাপিত হবে। আগামী ১৭ মার্চ, ২০২০ রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কোয়াডে বছরব্যাপী অনুষ্টেয় অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে “মুজিববর্ষ উদ্যাপিত হবে সার্বজনীনভাবে।

 

 

 

 

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন হোক মুজিব বর্ষের প্রেরণা-

“মুজিববষ” উদ্যাপনের প্রেরণা হোক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ বাস্তবায়ন- আমাদের ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ-রাজনীতি, কর্ম ও রাষ্ট্রনীতিতে। আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ পূর্বে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম (শেখ পরিবার) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাবা শেখ লুৎফুর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের ঔরসজাত সন্তান, সেদিনের সেই “খোকা” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শৈশবকাল থেকেই ছিলেন স্বাধীনচেতা, সততা, মানবপ্রেম, দেশাত্মবোধ ও বিপ্লবী চেতনার অধিকারী। প্রবাদ আছে, “গড়ৎহরহম ঝযড়ংি ঃযব ফধু” অর্থাৎ ভোরের আলোই হচ্ছে দিনের প্রতিচ্ছবি । তেমনি বঙ্গবন্ধুর শৈশবকাল থেকে তাঁর চলন-বলন, নীত-আদর্শই বলে দেয় যে, তিনি পরবর্তী সময়ের একজন মহীরুহ, মহাপুরুষ। বঙ্গবন্ধুর সেই অসাধারণ ব্যক্তি ও চারিত্রিক গুণাবলী প্রস্ফুটিত হয় তাঁর শৈশব থেকে শুরু করে জীবনব্যাপী মহা কর্মযজ্ঞে। যেমন-

 গ্রামের বন্ধুদের সাথে দিনভর খেলাধুলার পর বিকেলে সব বন্ধুদের সাথে নিয়ে বাড়ীতে এসে মায়ের কাছে সবাইকে খাবার দেয়ার আহ্বান। মা’ও হাসিমুখে সন্তানের সেই আবদার পূরণ করতেন।
 বর্ষাকালে নিজের ছাতা গরীব বন্ধুকে দিয়ে, নিজে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ীতে আসা।
 বাবার কিনে দেয়া চাদরখানা শীতার্ত বৃদ্ধাকে দিয়ে বুক ফুলিয়ে বাড়ীতে এসে বললেন, বাবা আমি চাদরখানা পথের এক বৃদ্ধা মহিলাকে দিয়ে দিয়েছি। এমন উদারতা! মানবতা! বন্ধুপ্রীতি! সত্যিই খুবই বিরল।
 ১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুল পরিদর্শনে এলে বঙ্গবন্ধু স্কুলের ছাদ দিয়ে পানি পড়ার সমস্যা সমাধানসহ ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠার দাবী তুলে ধরার মাধ্যমে অধিকার/দাবী আদায়ে তাঁর সাহস, প্রজ্ঞা ও মেধার পরিচয় দেন।
 ১৯৪৩ সালে সক্রিয়ভাবে মুসলীমলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পরবর্তী ভাষা আন্দোলন, ছয়দফা, গণঅভ্যুত্থান ইত্যাদি আন্দোলনের মাধ্যমে মাতৃভাষা, দেশের স্বাধীনতা-স্বাধীকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, জেল-জুলুমসহ অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন।
 সশ¯্র ক্ষমতাধর পাকিস্তানী বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু অসীম সাহসিকতা,দৃঢ় মনোবল, প্রবল আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে সুদৃঢ় চিত্তে, দৃপ্ত কন্ঠে জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করেন; “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।” বঙ্গবন্ধুর এমন জ্বালাময়ী, প্রেরণাদায়ক ভাষণে স্বাধীনতা পিপাসু নিরস্ত্র বাঙালীরা স্বাধীনতার সু-পেয়, অমিয় সুধা পানের জন্য নব উদ্যমে, দৃঢ় মনোবল ও অসীম সাহসিকতার সাথে ঝাপিয়ে পড়ে মুক্তি সংগ্রামে। কৃষক-মজুর, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী তথা সর্ব শ্রেণির নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংগ্রামে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলার আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য, সবুজ-শ্যামল বাংলার বুকে উড়ে লাল-সবুজের কেতন, বিশ্ব মানচিত্রে স্থাপিত হয় স¦াধীন বাংলাদেশ। আর এই দূর্লভ,কাঙ্খিত বিজয়ের মহানায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিুর রহমান।
 ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, ১২ জানুয়ারী রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ পূর্বক প্রশাসনিক ব্যবস্থার পূনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, এক কোটি মানুষের পূনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে বিনামূল্যে বই বিতরণ, মদ,জুয়া,ঘোড় দৌড়সহ সমস্ত ইসলাম বিরোধী কার্যক্রম কার্যকরভাবে নিষিদ্ধকরণ, ইসলামকি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পূনর্গঠন, ১১ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্টাসহ প্রায় ৪০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ, দুস্থ মহিলাদের কল্যাণের জন্য নারী পূনর্বাসন সংস্থা, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ ইদ্যাদি কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান উন্নয়নের অগ্রপথে।
 বঙ্গবন্ধুর এসমস্ত কার্যক্রম, আদর্শ, রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে তাঁর যে অন্যতম বৈশিষ্টগুলো প্রাধান্য পায় তা হলো- সর্বোচ্চ ত্যাগ, প্রশ্নাতীত সততা, দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অসীম সাহস, মানবতাবাদী এবং লক্ষ্যে অবিচল।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী তথা “মুজিববর্ষ” উদযাপনের পাশপাশি বঙ্গবন্ধুর উপর্যুক্ত সোনালী আদর্শগুলো অনুসরণ, অনুকরণ পূর্বক বাস্তবায়িত হোক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার, সোনার মানুষের কৃত-কর্মে, ধ্যানে-প্রাণে, সমাজ-রাষ্ট্রে। মুজিব বর্ষে এই হোক আমাদেরথ প্রত্যয় ও প্রত্যাশা।

 

মোঃ রুহুল আমিন

সহকারী শিক্ষক
গনেশ্বরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
মোবা: ০১৭২৫-২৮৪৩৩৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!